Author: অমর বন্দ্যোপাধ্যায়
Email: No Email
ছোটোগল্প
আমি মরি নি
অমর বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রথম মেয়েটি বললো, আমি তোমাকে ঘটনাটি সম্পর্কে কিছুই বলতে পারব না। আমি মৃত।
হতচকিত দ্বিতীয়জন। ভয়ে ওর দিকে তাকালো। মৃত? বিস্মিত সে।
তৃতীয়জন অবিচলিত, নিরাসক্ত এবং ভাবলেশহীন। সে জিজ্ঞাসা করলো, কী ভাবে মারা গেলে তুমি?
প্রথমজন বললো, ধান ক্ষেতের মাঝ বরাবর পাকা রাস্তা ঢুকে গেছে আমাদের গ্রামে। নামটা হয়তো তোমরা শুনে থাকবে, কামদুনি। গ্রামে ঢোকার মুখে মাঠ ও পুজো মণ্ডপ, তার পাশ দিয়ে কিছুটা হাঁটলে আমাদের কাঁচা ঘর। কলেজ থেকে ফিরছিলাম। আমি প্রায় রাস্তা শেষ করে এনেছি। জোরে জোরে হাঁটছিলাম কারণ সূর্য ডুবছে আর আঁধার নামছে। হঠাৎ কয়েকটা ছায়া মূর্তি পাকুর গাছের পাশ থেকে উঁকি দিল। আমি একজনকে চিনতে পারলাম,সাজ্জাত ভাই। কিছু বলবার আগেই ওরা আমার মুখ গামছা দিয়ে বেঁধে দিল। আমার ছিল কোমর ছাপানো চুল। সেই চুলের গোছা ধরে হিড় হিড় করে টানতে টানতে পোড়ো বাড়ির আমবাগানে নিয়ে গেল ওরা, চারজন। পাড়ার ছেলে, পঞ্চায়েত মেম্বার। ওরা যা বলে, তাই আইন। একজন বলল ছিঁড়ে ফ্যাল সালোয়ার কামিজ। আরেকজন ফিস ফিস করে বলল মারিস না। আমার চেনা। ছোটবেলায় একসাথে খেলেছি। তারপর আমাকে ঠেসে ধরে রাখলো দুজন। আমি অবশ হয়ে পড়ে লাগলাম।
তৃতীয়জন বললো,আর কাব্যি করে বলতে হবে না তোমাকে। যা করার তো করলো কিন্তু মারল!
চিনে ফেলি যে এবং হাত দিয়ে গামছার বাঁধন খুলে চিৎকার করে বলি - ছাড়বো না তোদের, জানোয়ার! সবচেয়ে যে খুব পরিচিত সেই মামুন বললো, পেঁড়ে ফ্যাল ওকে, মেরে দে। আমি দুহাত জোর করে বললাম, মেরো না, মেরো না আমাকে…
তৃতীয়জন বললো, তারপর মারা গেলে?
না। মরি নি তো!
তাহলে !
এই যে আমি মৃতদেহ নিয়ে এসেছি।
নিজের মৃতদেহ নিজে বহন করছো?
কী করবো বোন? আমার যে বিচার হয় নি।
দ্বিতীয়জন বললো, ঠিক আমার মতো!
প্রথমজন বললো, তুমিও মৃত?
না, আমি মরিনি।
তাহলে!
বিচারের আশায় নিজের ডেডবডি নিয়ে ঘাড়ে করে বহে চলেছি, বোন।
কিন্তু কী হয়েছিল?
ঘরে একা থাকতাম। ছেলে আর বাপ গিয়েছে ভিনদেশে কাজে। মেম্বরদাদা এসে রোজই ফুসলাতো, বলতো কানি, তু চল। সোয়াগে থাকবি, খাওয়া, টাকা পয়সা পাবি। ভয়ে আমার গা সিঁটিয়ে উঠত, বলি কুনজর দাও ক্যানে দাদা। শোনলো নাই। একদিন জোরজবরদস্তি কইরে তিনচারজনকে লিয়ে দরমার আর্গল ভাইঙে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওরা। ছিঁড়ে খুঁড়ে ফেললে আমারি। উরি বাপ… যেন কতগুলো হায়েনা।
তারপর …. মারা গেলে!
না, মরিনি। এই যে মৃতদেহ কাঁধে করে নিয়ে চলেছি।
তৃতীয় জন নিস্পৃহ কিন্তু চোয়াল শক্ত করে বললো, আমি চেয়েছিলাম দুর্নীতির চাইদের মুখোশ খুলে দিতে। দিন রাত জেগে ডিউটি দিয়েছি। প্রতিদিন শয়ে শয়ে রোগী, তারপর নিজের প্রজেক্টের কাজ তবু টাকা দিতে হবে, নাহলে পাশ করাবে না। ডেড বডি মর্গ থেকে পাচার হবে, ওষুধ বাইরে বেরিয়ে যাবে,রাতের বেলায় হাসপাতালে মদ মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করবে, ড্রাগ বিক্রি হবে আর কিছু ক্ষমতাবান টাকার পাহাড় তৈরি করবে। আমি বাঁধা দিয়েছিলাম তাই ওরা কয়েকজন মিলে আমাকে ….
মেরে ফেললো?
ওরা জানে মানুষকে এভাবেই খুন করতে হয়। কিন্তু না, আমি মরি নি। আমাকে জোর করে মা-বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। সব প্রমাণ লোপাট করে দিয়েছে কিন্তু আমি মরি নি।
তাহলে …
আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি। শুধু হাসপাতালে নয়, এখন আমার যাতায়াত সর্বত্র। জলে স্থলে অন্তরীক্ষে - সর্বত্র আমাকে পাবে। তবে তোমাদের মতো ডেডবডি বহন করতে হচ্ছে না আমাকে।
তাহলে !
আমি বাতাসে আছি। সূর্যের আলোয় আছি। তারায় তারায় আমার অজস্র চোখ জেগে আছে।
ওই যে মানুষ, ছেলেমেয়েরা,মা বাবারা,প্রপিতামহরা,অসংখ্য গাছপালা, পশুপাখি, সমুদ্র,পাহাড়,আকাশ - সবকিছুর মাঝে আমি আছি।
কী ভাবে?
যেহেতু আমাকে নিয়ে দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই করছে মাথা না - নোয়ানো অসংখ্য মানুষ। জয়ের পতাকা উড়ছে গাঁয়ে গাঁয়ে, খেয়া ঘাটে, ডিঙি, নৌকাতে, নদীর জোয়ারে। শত হামলা, মামলার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষের লড়াই চলছে। মরতে পারি আমরা?
প্রথমজন, কামদুনির মেয়েটি বললো - আমাকে কেনা যায় না। পটাসপুরের বউটি বললো আমাকেও। তৃতীয়জন বললো আমি ডাক্তার। আমি চুপি চুপি মা-কে বলে এসেছি মা, এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রকৃত শহীদ তো তুমি। শহীদের যেমন কোনো ঘর নেই, তোমারও নেই। তোমার কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। তুমি কখনও বাপের বাড়ি, কখনও শ্বশুর বাড়ি,কখনও স্বামীর বাড়ি থাকো। এ সব তো পুরুষের স্থায়ী ঠিকানা, তোমার ঠি
কানা কই? আমি সেই স্থায়ী ঠিকানা চাই। আমি মরি নি। আমি মরি না কখনও।